আজ ১২ই ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮শে অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫শে রবিউল-আউয়াল ১৪৩৯

মানবাধিকার ও স্বাধীনতা

নভেম্বর ১৪, ২০১৭

আজকে আমি মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলবো। বিশ্বের কোন দেশেই ১০০% মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নাই। তবু আমরা এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হতে দেখি বিভিন্ন গোষ্টির আর্থসামাজিকরাজনৈতিক স্বার্থে। চলুন কইবেক থেকে ঘুরে আসি। কুইবেক কানাডার একটি প্রদেশ। সেখানে মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নাই।

সেটা কিভাবে সম্ভব ? অবশ্যই সম্ভব। কানাডা একটি মাল্টিকালচারাল দেশ তার অর্থ হলো সাড়া বিশ্বের মানুষ কানাডাতে এসে তাদের বাসস্থান বানিয়েছে এবং যার যার সাংস্কৃতি সে সে চর্চা করে যার যার কমিউনিটির ভেতর।  কুইবেকের একটি ডেকেয়ারে একজন মহিলাকে বোরখা পড়তে বারণ করা হয়। কুইবেকের সংসদে বিল পাস করে বোরখা নিষিদ্ধ করা হয়। বোরখা পড়তে বারণ করার কারণ হিসাবে বলা হয় যে এই ডেকেয়ারের শিশুরা এই মহিলাকে দেখে ভয় পায়। এই মহিলার সম্পুর্ন মুখ দেখা আবশ্যক । শিশুরা সব চাইতে নির্ভিক হয়। কারণ ভয় বা সাহস শব্দ সম্পর্কে শিশুদের কোন ধারণা নেই। একটি শিশুর সামনে যদি একটি বাঘ এসে দাড়ায় তবুও শিশুটি ভয় পাবেনা যদি তাকে তার মা বা বাবা না বলে
“খবরদার বাঘের সামনে যেওনা তাহলে বাঘ তোমাকে খেয়ে ফেলবে”

যখন এই কথাটি শিশুকে বলে সাবধান করা হবে তখনই মাবাবা শিশুটির মনে বাঘ্রভীতি প্রবেশ করিয়ে দিলো। শিশুর মনে ব্যাঘ্র ভীতি প্রবেশ করাণোর কারণ হলো শিশুকে নিরাপদ রাখা। শিশু জানেনা বাঘ তাকে খেয়ে ফেলতে পারে। মাবাবার দায়িত্ব শিশুকে সেই তথ্য জানানো। কুইবেকের সেই ডেকেয়ারের শিশুরা জানেনা বোরখাঁর অন্তঃরালে এই মহিলাটি একজন সন্ত্রাসী এবং আত্মঘাতী বোমা বেল্ট থেকে বের করে শিশুদের উড়িয়ে দিতে পারে। এটা তারা জেনেছে তাদের মাবাবার কাছ থেকে। শিশুদের মাবাবারা সাম্প্রদায়িক। আর এই সাম্প্রদায়িকতাই  কুইবেকে বোরখা নিষিদ্ধ করেছে।

তাহলে কোথায় থাকলো মানবাধিকার ও স্বাধীনতা ?
আমি বোরখা পড়ি বা বিকিনি – সেটা আমার খুশী। অবশ্য বিকিনি পড়লে আমাকে অনেক সুন্দর দেখাবে সেক্ষেত্রে ট্রাফিক জ্যাম, অনেকেই আমার প্রেমে পড়ে যেতে পারে বা আকৃষ্ট হয়ে সড়ক দুর্ঘটনাতে মারা যেতে পারে সেক্ষেত্রে বিকিনি পরিধান করে রাস্তা দিয়ে হেটে বা পাবলিক বাসে চড়ে ডেকেয়ারে কাজ করতে যাওয়াটা মোটেই সামাজিকভাবে নিরাপদ নয়। একজন দায়িত্ববান ডেকেয়ার কর্মী এহেন আচরণ করতে পারেনা।  দেশের একজন নাগরিক হিসাবে আমি নিজে যেমন নিরাপদ থাকতে চাই তেমনি আমি এমন কিছু করতে পারিনা যাতে অন্যরা নিরাপত্তাহীনতাই ভোগে। কিন্তু অতিরিক্ত কাপড় পরিধান করলে তো সমস্যা হবার কথা নয়। আমি যদি বোরখা পরিধান করে রাস্তা দিয়ে হেটে যেতে পারি এবং কারুকে ধাক্কা না দেই তাহলেই তো আর কোন সমস্যা থাকেনা। আমি কি ধরণের পোষাক পরিধান করবো সেটা আমার সিদ্ধান্ত। এবং সেটাই আমার মানবাধিকার ও স্বাধীনতা। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলেই বোরখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিভিন্ন স্কুলে এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্লাসের শিক্ষক একটি ছাত্রীকে বোরখা পড়ে আসতে নিষেধ করে।

শিক্ষকের কাজ হলো ক্লাসে পড়ানো। কে কি কাপড় পরিধান করবো সেটা দেখার দায়িত্ব থাকতো কিন্ডারগার্টেনের ড্রিল টীচারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বা হাইস্কুলের শিক্ষকের নয়। জিনসের টাইট প্যান্টস পড়ে এলে শিক্ষকের নিম্নাঙ্গ শিহরিত হয় কিন্তু বোরখা দেখলে সেটা হয়না সেজন্য হতে পারে এই সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা অপরাধ। সেটাই আইন হওয়া উচিৎ ।

একটি নারী যে তার মুখ মাথা ও দেহ অতিরিক্ত পোষাকে ঢেকে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সে রাখুক ঢেকে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করুক।  যখন সে তার পোষাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে তখন সে কর্মক্ষেত্রে ভাল কাজ করবে। মানুষ হিসাবে সেটা তার অধিকার এবং স্বাধীনতা।  ফ্রান্সেও হিজাব এবং বোরখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিছুদিন আগে দেখেছিলাম ফ্রান্সের একটি সমুদ্র সৈকতে কিছু বোরখা পরিহিতা মহিলাকে পুলিশ বিকিনি পড়তে বাধ্য করছে।

এইখানে সব চাইতে মজার ব্যাপার হলো আমি যদি বোরখা পরিধান করি তার অর্থ আমি একজন পর্দানসীন মহিলা। একজন পর্দানসীন মহিলা অফিসে যেতে পারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কিন্তু সমুদ্র সৈকতে একজন বোরখা পড়া মহিলা গেছে হয়তো সূর্যাস্ত দেখতে যা ঘরে বসেও দেখা যেতো। যাক আমার কোন অসুবিধা নাই। তবে বোরখা পরিধান করার অর্থ হলো পর্দা করা। ফ্রান্সের যেকোন সমুদ্র সৈকতেই উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ নারী পুরুষের সমাবেশ থাকে । সেখানে একজন পর্দানসীন মহিলা কি কাজে গেছিল আমার জানা নাই। তবে ব্যাপরটা বেশ কৌতুককর।

পর্দা প্রথা মূলত নারীদের নিরাপত্তার কারণে প্রবর্তিত হয়। অতীতে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পরে নারীরা নামাযের জন্য মসজিদে যেতেন । এখনকার  মত সেসময়েও ইভটিজিং চলতো ব্যাপক হারে। নারী ধর্ষন, নারীর দেহে আগুন দিয়ে হত্যা ও নারী নির্যাতন সবই চলতো ফলে নারীকে নিরাপদ করার জন্য ইসলাম ধর্মে পর্দা প্রথার প্রবর্তন করা হয় । মহানবী হজরত মোহাম্মদ সাঃ নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করেন। একটি হাদিসে বর্ণীত আছে – মহানবী হজরত মোহাম্মদ সাঃ বলেন – নারীদের প্রতি পুরুষেরা আকৃষ্ট হবে এটা খুব স্বাভাবিক।  নারীরা পুরুষের চাইতে শারীরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং নিজেদের রক্ষা করতে অক্ষম সেজন্য নারীদের উচিৎ পর্দার ভেতর থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নারী নির্যাতন না করে নারীকে তালাক দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়। মহানবী হজরত মোহাম্মদ সাঃ বলেন মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেস্ত। স্ত্রী যখন সন্তানের মা তখন স্ত্রীকেও সন্মান করতে হবে, নিরাপদ করতে হবে আর সেকারনেই ইসলাম ধর্মে পুরুষের উপর স্ত্রীর ভরণপোষনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।  স্ত্রীর ভরণ পোষনের দায়িত্ব পুরুষের আর সেভাবেই নারীকে সম্পুর্নভাবে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব। পুরুষের দায়িত্ব নারীকে ভালবাসা, ভাল রাখা, ভরণপোষনের দায়িত্ব পালন করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জন্মের পরে মেয়ে শিশুর লালন পালন করেন মাবাবা। বিয়ের পরে স্বামী। স্বামীর মৃত্যু হলে ভাই এই দায়িত্ব পালন করেন। যাতে নারীকে বাইরে যেতে না হয় আর বাইরে যেয়ে শকুনের পালের মুখোমুখি নিজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না হয়। এটাই ছিল পর্দার মূল কারণ – নিরাপত্তা।  অতীতে যেকোন ধর্মের মহিলারা মাথায় কাপড় ও চাদর পরিধান করে বাইরে যেতেন।

ফিরে আসি কানাডার ফ্রেঞ্চ প্রদেশ কুইবেকে। কানাডার যেকোন শহরই মোটামুটি নিরাপদ। নিজের নিরাপত্তা নিজের কাছে। আমি যদি ভোর ১টার সময়ে মিনি স্কার্ট পরে রাস্তা দিয়া হাটি তাহলে যদি কোন মাতাল বা মাদকাশক্ত মানুষ সেখানে থাকে, নির্জন পথে একটি মেয়ে তার অর্ধেক শরীর দেখিয়ে হেটে যাচ্ছে, মাতাল না হলেও পুরুষকে সে আকৃষ্ট করতে পারে। আমার যদি আসলেই ভোর ১টার সময় বাইরে কোন কাজে যেতেই হয় তাহলে নিজের নিরাপত্তার জন্য আমাকে দুইটা ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

এক – পোষাক।
দুই – পথ।

আমি এমন একটি পথে বেছে নেবো যেখানে সব সময় গাড়ী চলাচল করে। যে পথ মোটামুটি নিরাপদ।
অথবা ট্যাক্সি করে যাবো। অথবা কারুকে সাথে নিয়ে যাবো। কেউ যদি না থাকে তাহলে যাবোই না।  কারণ আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার নিজের। ৯১১ কল করলে এখানে পুলিশ আসতে লাগে সাত মিনিট কিন্তু যৌন হয়রানীর জন্য সাত মিনিট যথেষ্ট সময়। সাত মিনিটে এমন এক পর্যায়ে চলে যেতে পারে যখন আমার আর পুলিশ ডাকার ক্ষমতা নেই।

এছাড়া কানাডার প্রায় শহরই মোটামুটি নিরাপদ। পর্দা করার কোন দরকার নাই। যেদেশে ভাল আইন আছে এবং আইন অমান্যকারীদেরকে নিরপেক্ষভাবে শাস্তি দেবার ব্যবস্থা আছে সেদেশে “নিরাপত্তার” জন্য বোরখা বা হিজাব পরিধান করার কোন দরকার নাই। তবে কেউ যদি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তাহলে হিজাব বা বোরখা পড়লে কুইবেক ছাড়া কানাডার অন্য কোন প্রদেশে এই নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়না।

আমার যদি স্বামী থাকতেন (অবশ্যই প্রেমময়) আর তিনি যদি বলতেন – দোহাই লাগে নুন আর ভাত খেয়ে থাকো, বাসার ভেতর বিকিনি পরিধান করে থাকো কিন্তু বাইরে যেওনা , লাগবেনা আমার দশ বিঘা জমিতে সুইমিং পুলওয়ালা বাড়ী, শুধু আমার বুকের ভেতর নিরাপদ থাকো। আমি জীবনেও বাইরে কাজ করতে যেতামনা। কিন্তু আমার স্বামী তার জন্মের আগেই মারা যাবার ফলে তেমনটা হয়নি সেজন্য  বুদ্ধি হবার পর থেকেই কাজ করছি ফলে পর্দা করতে পারি নাই। আমি পর্দা করতে পারি নাই বলে যারা পর্দা করে তাদের বিরুদ্ধে আমি ক্ষুদ্র ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতা পোষন করিনা। আমি অন্যদের মানবাধিকার ও স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করি।

কুইবেক প্রদেশের কোন অধিকার নেই, ফ্রান্সের কোন অধিকার নেই এই স্বাধীনতা কেড়ে নেবার। সৌদি আরবে সবাইকে বোরখা পরিধান করতে হয়। বিদেশী মহিলারা যারা কাজের জন্য সৌদি আরব যায় তারা সবাই বোরখা পরিধান করেন। পবিত্র ওমরা হজ্ব করতে আমরা যখন সৌদী আরব যাই তখন আমার মা সাথে ছিলেন। আমি বা মা আমরা কেউ বোরখা পরিধান করিনি। বড় একটা চাঁদর পরিধান করেছিলাম। এই চাদরটাই আমার কাফন হবার কথা ছিল। যখন দেশ ত্যাগ করি তখন ভুলে গেছিলাম সাথে আনতে তারপর যেহেতু আমাকে কেউ মনে রাখেনি, আমিও কখনো সেই ঘরে ফিরে যাইনি তাই আমার কাফনের কাপড়ের টুকরোটিও কোথায় হারিয়ে গেছে তা কেউ বলতে পারেনি।

মানবাধিকার ও স্বাধীনতা অর্থ হলো কাজ করার স্বাধীনতা, পোষাক পড়ার স্বাধীনতা,  শিক্ষালাভের স্বাধীনতা (বোরখা পরিধান করে বা না পরিধান করে), কথা বলার স্বাধীনতা, পথে নিরাপদে হাটার স্বাধীনতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার পাবার স্বাধীনতা, নিরাপদে, মানুষ হিসাবে সন্মানের সাথে বাঁচার স্বাধীনতা।  ঝাড়ুদার থেকে দেশের রাস্ট্রপ্রধান, প্রতিটি পেশাই গুরুত্বপূর্ন এবং সন্মানজনক কারণ প্রতিটি পেশারই উপযোগীতা রয়েছে। ঝাড়ুদারের পেশা এখানে একজন প্রধানমন্ত্রীর পেশা থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন । যদি রাস্তা পরিচ্ছন্ন না থাকে তাহলে সকালটাই মাটি হয়ে যাবে। যখন আমি প্রধানমন্ত্রী শব্দটা ব্যবহার করেছি তখন বাংলাদেশে ভারতের রাজ্যসরকারের কথা বলিনি।

বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য সেখানে কারু কোন স্বাধীনতা নাই। সবাই কেন্দ্রীয় সরকারের অঙ্গুলি হেলনে উঠেবসে। সেজন্য বাংলাদেশে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্ন অবান্তর। প্রথমে দেশ স্বাধীন হতে হবে তারপর দেশে আইন করতে হবে যে আইন জনগনের মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।

আয়শা মেহের
সম্পাদিকা
প্রবাসনিউজ২৪
টরেন্টো, কানাডা ।

সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০১ বার

( বি: দ্র: প্রবাস নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম -এ প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও, কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। কপিরাইট © সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত প্রবাস নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম )

আপনার ফেসবুক একাউন্ট ব্যবহার করে মতামত প্রদান করতে পারেনঃ

x
সর্বশেষ